দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
গাউছে পাকের কারামত সম্পর্কিত অসংখ্য ঘটনা ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত রয়েছে, যা আজও মানুষের হৃদয়ে বিস্ময় ও ঈমানের আলো জাগিয়ে তোলে। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বন্ধুদের এমন মর্যাদা দান করেন যে, তাঁদের দোয়ার বরকতে মানুষের জীবন থেকে বড় বড় বিপদ দূর হয়ে যায়। আজ আমরা জানব এমন এক ব্যবসায়ীর ঘটনা, যার তাকদীরে মৃত্যু ও সর্বস্ব হারানোর লিখন ছিল। কিন্তু গাউছে পাক রহমাতুল্লাহি আলাইহির দোয়ার বরকতে সেই ভয়াবহ পরিণতি পরিবর্তিত হয়ে যায়।
সফরের আগে অশনি সংকেত
আবুল মসউদ আহমদ বিন আবু বকর হরিমী বাগদাদী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন-
আবুল মুজাফফর হাসন বিন মীম নামে এক ব্যবসায়ী ব্যবসার উদ্দেশ্যে দূর সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। সফরে বের হওয়ার আগে তিনি আল্লাহর একজন ওলী হাম্মাদ দাব্বাস রহমাতুল্লাহি আলাইহির দরবারে উপস্থিত হয়ে দোয়া ও পরামর্শ প্রার্থনা করলেন।
হাম্মাদ দাব্বাস রহমাতুল্লাহি আলাইহি বললেন,
“তুমি যদি এ বছর সফরে যাও, তবে তোমাকে হত্যা করা হবে এবং তোমার সমস্ত মালপত্র লুট হয়ে যাবে।”
এই কথা শুনে ব্যবসায়ীর হৃদয় ভেঙে গেল। তাঁর চোখের সামনে যেন অন্ধকার নেমে এলো। তবুও তিনি আশা হারালেন না।
গাউছে পাকের আশ্বাস
এরপর তিনি গাউছে পাক, আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহির খেদমতে উপস্থিত হয়ে সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন।
সব কথা শুনে গাউছে পাক রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন,
“তুমি সফরে যাও। নিরাপদে ফিরে আসবে। আমি এর দায়িত্ব নিলাম।”
এই কথাগুলো তাঁর অন্তরে এমন প্রশান্তি এনে দিল, যেন সমস্ত ভয় দূর হয়ে গেছে। তিনি পূর্ণ ভরসা নিয়ে সফরে রওনা হলেন।
সফল ব্যবসা, কিন্তু এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা
গন্তব্যস্থলে পৌঁছে তিনি তাঁর পণ্যসামগ্রী বিক্রি করে এক হাজার দীনার লাভ করলেন। ব্যবসা সফল হওয়ায় তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হলেন।
এরপর তিনি একটি হাম্মামে (গোসলখানায়) প্রবেশ করলেন। সেখানে একটি তাকের ওপর দীনারভর্তি থলিটি রেখে গোসল করলেন। কিন্তু বের হওয়ার সময় অসাবধানতাবশত থলিটির কথা একেবারেই ভুলে গেলেন।
তিনি একটি সরাইখানায় গিয়ে বিশ্রাম নিতে লাগলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লেন।
মৃত্যুর বিভীষিকা
ঘুমের মধ্যে তিনি এমন এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখলেন, যা তাঁর হৃদয় কাঁপিয়ে দিল।
তিনি দেখলেন, একটি বাণিজ্য কাফেলার সঙ্গে সফর করছেন। হঠাৎ একদল সশস্ত্র ডাকাত বজ্রপাতের মতো কাফেলার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। চারদিকে চিৎকার, আতঙ্ক আর মৃত্যুর বিভীষিকা ছড়িয়ে পড়ল।
এক এক করে কাফেলার সবাইকে হত্যা করা হলো।
অবশেষে ডাকাতরা তাঁর দিকেও এগিয়ে এলো। তিনি নিজেকেও তাদের হাতে নিহত হতে দেখলেন। স্বপ্নটি এতটাই বাস্তব মনে হচ্ছিল যে, মনে হচ্ছিল তিনি সত্যিই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করছেন।
ঘুম ভাঙার পর যা ঘটল
আতঙ্কে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। বুক ধড়ফড় করছিল, শরীর ঘামে ভিজে গিয়েছিল।
তিনি নিজের ঘাড়ে হাত দিয়ে দেখলেন, যেন রক্তের চিহ্ন অনুভব করছেন। সারা শরীরে এমন ব্যথা হচ্ছিল, যেন স্বপ্নের আঘাতগুলো বাস্তবেই তাঁর ওপর নেমে এসেছিল।
ঠিক তখনই তাঁর মনে পড়ল- এক হাজার দীনারভর্তি থলিটি হাম্মামে ফেলে এসেছেন!
তিনি তড়িঘড়ি করে হাম্মামের দিকে দৌড়ে গেলেন। সেখানে পৌঁছে দেখলেন, থলিটি ঠিক আগের জায়গাতেই নিরাপদে রয়েছে।
তখন তিনি উপলব্ধি করলেন- আল্লাহ তাআলা তাঁকে শুধু মালপত্রই নয়, আরও বড় কোনো বিপদ থেকেও রক্ষা করেছেন।
রহস্য উন্মোচন
সফর শেষে তিনি বাগদাদে ফিরে এলেন এবং প্রথমে হাম্মাদ দাব্বাস রহমতুল্লাহি আলাইহির দরবারে উপস্থিত হলেন।
হাম্মাদ দাব্বাস রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁকে দেখেই বললেন,
“তুমি গাউছে পাক রহমতুল্লাহি আলাইহি কাছে যাও। কারণ তিনি তোমার বিপদ দূর করার জন্য আল্লাহর দরবারে সত্তরবার হাত তুলে দোয়া করেছেন।
তোমার তাকদীরে হত্যা ও ক্ষতি লেখা ছিল। কিন্তু তেনার দোয়ার বরকতে আল্লাহ তাআলা সেই লিখন পরিবর্তন করে দিয়েছেন। তোমাকে স্বপ্নে সেই দৃশ্য দেখানো হয়েছে। ফলে বাস্তবের হত্যা স্বপ্নে পরিণত হয়েছে এবং মাল হারানোর ঘটনাও তোমার জন্য কল্যাণের কারণ হয়েছে।”
গাউছে পাকের বিস্ময়কর বক্তব্য
এরপর তিনি গাউছে পাক রহমতুল্লাহি আলাইহির দরবারে হাজির হলেন।
তাঁকে দেখেই গাউছে পাক রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন,
“হাম্মাদ দাব্বাস কি তোমাকে আমার সত্তরবার দোয়া করার কথা বলে দিয়েছেন?”
তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন,
“জি হ্যাঁ, বাবা।”
তখন গাউছে পাক রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন,
“আমি সত্যিই তোমার নিরাপত্তা ও মুক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে সত্তরবার দোয়া করেছি। আল্লাহ তাআলা সেই দোয়া কবুল করেছেন। ফলে তোমার জন্য নির্ধারিত বিপদ দূর করে দিয়েছেন এবং জাগ্রত অবস্থায় ঘটার কথা ছিল যে ঘটনা, তা স্বপ্নে রূপান্তরিত করেছেন।”
এরপর তিনি পবিত্র কুরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন-
”আল্লাহ যা ইচ্ছা তা মিটিয়ে দেন এবং যা ইচ্ছা তা স্থির রাখেন; আর তাঁর কাছেই রয়েছে মূল গ্রন্থ (উম্মুল কিতাব / লওহে মাহফূজ)।”
— (সূরা আর-রা‘দ: ৩৯)
গাউছে পাকের কারামত থেকে শিক্ষা
এই ঘটনা গাউছে পাকের কারামত-এর এক উজ্জ্বল নিদর্শন। এর মাধ্যমে আমরা উপলব্ধি করি, আল্লাহ তাআলার ক্ষমতার সামনে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। তিনি চাইলে বিপদকে নিরাপত্তায়, ক্ষতিকে কল্যাণে এবং মৃত্যুর আশঙ্কাকে জীবনের সুসংবাদে পরিণত করতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বন্ধুদের দোয়ার মাধ্যমে মানুষের জন্য রহমতের দরজা খুলে দেন। তাই ওলী-আল্লাহদের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান রাখা একজন ঈমানদারের ঈমানি দায়িত্ব।
পরিশেষে
গাউছে পাকের কারামত সম্পর্কিত এই হৃদয়স্পর্শী ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহ তাআলার রহমত ও তাঁর বন্ধুদের দোয়া মানুষের জীবনকে বদলে দিতে পারে। যখন চারদিক থেকে বিপদ ঘিরে ধরে, তখনও আল্লাহর সাহায্য অদৃশ্য উপায়ে এসে পৌঁছাতে পারে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরে তাঁর প্রিয় ওলী-আল্লাহদের প্রতি সত্যিকারের মহব্বত দান করুন, তাঁদের আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক নসীব করুন এবং আমৃত্যু ঈমানের উপর অটল থাকার সৌভাগ্য দান করুন। আমীন।






