দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতিটি কদম মোবারক ছিল অলৌকিক মুজিযা এবং পরম বাতেনি রহস্যে ঘেরা। তেনার কুদরতি হাতের একটিমাত্র স্পর্শ কিংবা যবান মোবারকের লালা যে জগতের যেকোনো মরণঘাতী বিষকে মুহূর্তের মধ্যে জান্নাতী অমৃতে রূপান্তর করতে পারে-গারে সওরের ঐতিহাসিক ঘটনা তারই এক চাক্ষুষ ও জ্যান্ত প্রমাণ। ওলী-আউলিয়া ও আরিফ বিল্লাহগণ বলেন, কায়েনাতের প্রতিটি সৃষ্টি, এমনকি বিষধর সাপও নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শান ও মান চাক্ষুষ অনুভব করতে পারে। আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন ও ঈমান জাগানিয়া মুজিযা- গারে সওরের গুহায় হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে সাপের দংশন এবং নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কুদরতি লালা মোবারকের অলৌকিক মুজিযার বাতেনি হাকিকত চাক্ষুষ আলোচনা করব, যা আপনার কলবকে ইশকের নূরে জ্যান্ত ও শক্তিশালী করবে।
গারে সওরের প্রেক্ষাপট: সিদ্দিকে আকবরের এক পরম পরীক্ষা
মক্কার কাফেরদের চরম অত্যাচার ও হত্যার ষড়যন্ত্রের পর, যখন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে হিজরতের চূড়ান্ত হুকুম এল, তখন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের সফরের সঙ্গী হিসেবে বেছে নিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে। মক্কা থেকে মদীনার পথে রওয়ানা হয়ে কাফেরদের চোখ ফাঁকি দিতে তেনারা মক্কার অদূরে অবস্থিত জাবালে সওর বা সওর পাহাড়ের একটি অন্ধকার গুহায় আশ্রয় নিলেন। ইতিহাসে এই গুহাটিকেই ‘গারে সওর’ বলা হয়।
গুহাটি ছিল অত্যন্ত প্রাচীন, অন্ধকার এবং শত শত বিষাক্ত সাপ ও বিচ্ছুর চারণভূমি। গুহার মুখে পৌঁছে হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আরজ করলেন- “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা-মাতা আপনার কদমে কুরবান হোক! আপনি ভেতরে প্রবেশ করার পূর্বে আমাকে অনুমতি দিন, যেন আমি গুহাটি পরিষ্কার করতে পারি। ভেতরে যদি কোনো ক্ষতিকারক কীট-পতঙ্গ থাকে, তবে তা যেন আপনাকে কষ্ট না দিয়ে প্রথমে আমাকে দংশন করে।” সুফি তরিকায় একেই বলা হয় ‘ফানা ফিল রাসূল’ বা মাহবুবের সুরক্ষায় নিজের জীবনকে বিলীন করে দেওয়া।
জামা ছিঁড়ে গর্ত বন্ধ করার মরমী দৃশ্য
হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু গুহার ভেতরে প্রবেশ করে নিজের চাদর ও জামা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করলেন এবং গুহার দেয়ালে থাকা বিষাক্ত সাপের গর্তগুলো একে একে বন্ধ করতে লাগলেন। কিন্তু সমস্ত গর্ত বন্ধ করার পর দেখা গেল একটি বড় গর্ত তখনো খোলা রয়ে গেছে, অথচ তাঁর কাছে আর কোনো কাপড় অবশিষ্ট ছিল না।
হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে নিজের ডান পায়ের গোড়ালিটি সেই বিষাক্ত সাপের গর্তের মুখে চেপে ধরলেন, যেন কোনো সাপ বের হয়ে তেনার হৃদয়ের স্পন্দন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে আঘাত করতে না পারে। এরপর তিনি গুহাটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ঘোষণা করে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে ভেতরে আহ্বান করলেন। দীর্ঘ ক্লান্তিকর সফরের পর নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর কোলের ওপর মাথা মোবারক রেখে চোখ মোবারক বন্ধ করলেন।
হাজার বছরের আশেক সাপের দংশন ও অশ্রু বিসর্জন
হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু যে গর্তের মুখে পা দিয়েছিলেন, তার ভেতরে ছিল এক আদি ও আশেক সাপ। সুফি কিতাবের বর্ণনা অনুযায়ী, সেই সাপটি হাজার বছর ধরে এই গুহায় অপেক্ষা করছিল যে-একদিন আখেরি নবী, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই গুহায় আসবেন এবং সে তেনার নূরের চেহারা মোবারক জিয়ারত করবে। কিন্তু আজ যখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এল, তখন হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর পা তেনার জিয়ারতের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল।
সাপটি বাতেনি ব্যাকুলতায় অস্থির হয়ে বারবার গর্ত থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পা থাকায় পারল না। অবশেষে উপায় না দেখে সাপটি হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর পায়ে তীব্র বেগে দংশন করল। সাপের সেই মরণঘাতী বিষ মুহূর্তের মধ্যে সিদ্দিকে আকবরের ধমনিতে ছড়িয়ে পড়ল এবং প্রচণ্ড যন্ত্রণায় তাঁর শরীর নীল হয়ে যেতে লাগল। কিন্তু আল্লাহর কী অসীম কুদরত! পা সরালে যদি নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আরামের ব্যাঘাত ঘটে, এই ভয়ে তিনি বিন্দুমাত্র নড়াচড়া করলেন না। কিন্তু যন্ত্রণার তীব্রতায় তাঁর চোখ বেয়ে টপ টপ করে অশ্রু ঝরতে লাগল এবং সেই অশ্রুর এক ফোঁটা পানি নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র গাল মোবারকের ওপর পতিত হলো।
কুদরতি লালা মোবারক এবং বিষ অমৃতে রূপান্তরের অলৌকিক মুজিযা
অশ্রুর স্পর্শে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম চোখ মেলে দেখলেন তাঁর পরম বিশ্বস্ত সহচর যন্ত্রণায় কাঁপছেন। নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন— “হে আবু বকর! কী হয়েছে তোমার?” আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু অত্যন্ত আদবের সাথে আরজ করলেন- “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা-মাতা আপনার কদমে উৎসর্গ হোক, আমাকে গর্তের ভেতর থেকে কোনো এক বিষধর সাপ দংশন করেছে।”
ব্যথা ও বিষের তীব্রতা দেখে দয়ার সাগর নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের পবিত্র মুখের লালা মোবারক সাপের দংশন করা সেই ক্ষতস্থানে কুদরতি হাতে মাখিয়ে দিলেন। স্পর্শ করা মাত্রই ঘটল সেই মহাজাগতিক অলৌকিক মুজিযা! সাপের সেই তীব্র মরণঘাতী নীল বিষ এক সেকেন্ডের মধ্যে জান্নাতী অমৃতে পরিণত হয়ে গেল এবং হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে পরম শান্তি লাভ করলেন। তেনার শরীরের সমস্ত নীল রঙ কেটে নূরের আভা চাক্ষুষ ফুটে উঠল।
সাপের সাথে কথোপকথন ও ওলী-আল্লাহদের বাতেনি তাফসীর
বিষ দূর করার পর নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই সাপের গর্তের দিকে তাকালেন এবং সাপটিকে সামনে আসার হুকুম দিলেন। সাপটি বের হয়ে এসে নিজের মাথা নিচু করে আরজ করল- “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার উম্মতের ওপর কোনো শত্রুতার কারণে দংশন করিনি। আমি যুগ যুগ ধরে এই অন্ধকার গুহায় আপনার নূরের চেহারা মোবারক দেখার ইশকে ব্যাকুল ছিলাম। কিন্তু আপনার সাহাবীর পা আমার দেখার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তাই আমি ব্যাকুল হয়ে দংশন করেছি।”
উপসংহার
নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গারে সওরের এই সুমহান মুজিযা আমাদের যান্ত্রিক কলবকে এক পরম আধ্যাত্মিক ধাক্কা দেয়। বাহ্যিক লৌকিকতা ও জাগতিক অহংকার পরিহার করে হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর মতো নিজের নফস ও জানকে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কদমে বিলীন করে দিতে হবে। আসুন, আমরা দয়াল নবীজির শানে বেশি বেশি দরুদ শরীফ পাঠ করি এবং ওলী-আল্লাহদের বাতেনি দর্শনের আলোয় নিজেদের ঈমানকে জ্যান্ত ও শক্তিশালী করি। আমিন।










