দয়াল নবী আপনার দরবারে আমি গোলাম হাজির হইয়াছি।
উহুদ যুদ্ধের সেই কঠিন মুহূর্ত
হিজরি তৃতীয় সনে সংঘটিত ঐতিহাসিক উহুদ যুদ্ধ ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি পরীক্ষা। কাফেরদের তীব্র আক্রমণের মুখে সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম নিজেদের জীবন বাজি রেখে দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে রক্ষা করার জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
সেই বীর যোদ্ধাদের মধ্যে অন্যতম একজন মহান সাহাবি ছিলেন হযরত কাতাদাহ ইবনে নুমান রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন এবং ধনুক হাতে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে দাঁড়িয়ে কাফেরদের তীর প্রতিহত করছিলেন।
বীর সাহাবির চোখ হারানোর হৃদয়বিদারক ঘটনা
যুদ্ধের একপর্যায়ে কাফেরদের দিক থেকে ধেয়ে আসা একটি মারাত্মক তীর সরাসরি হযরত কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখের ভেতরে এসে বিদ্ধ হয়। তীরের আঘাতে তাঁর চোখের মণিটি অক্ষিকোটর থেকে উপড়ে বাইরে বের হয়ে আসে। চোখের মণিটি চামড়ার সাথে ঝুলে তাঁর গালের ওপর এসে পড়েছিল।
তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যান। যুদ্ধের ময়দানে রক্তক্ষরণের মাঝেও তাঁর একমাত্র চিন্তা ছিল- তিনি হয়তো আর কোনোদিন নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূরানী চেহারা মোবারক চাক্ষুষ দেখতে পাবেন না।
রহমতের নবীর দরবারে আকুল আবেদন
যুদ্ধ শেষে অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও রক্তাক্ত অবস্থায় হযরত কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে হাজির হলেন। গালের ওপর ঝুলতে থাকা চোখটি হাত দিয়ে ধরে তিনি নবীজির সামনে দাঁড়ালেন।
সাহাবির এই করুণ দশা দেখে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চোখ মোবারক অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। তিনি ব্যথিত হৃদয়ে সাহাবিকে কাছে ডাকলেন।
হযরত কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু আরজ করলেন, “ইয়া রাসূল আল্লাহ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি আমার পরিবারকে অত্যন্ত ভালোবাসতাম। কিন্তু আমার এই অবস্থা দেখে তারা হয়তো আমাকে অপছন্দ করবে। সবচেয়ে বড় কষ্ট, আমি আপনাকে আর দেখতে পাবো না।”
নূর নবীজির হাতের স্পর্শে জ্যান্ত মুজিযা
রাহমাতাল্লিল আলামিন, নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর দেরি করলেন না। তিনি নিজের পবিত্র হাত মোবারক বাড়িয়ে দিলেন। সাহাবির ঝুলন্ত চোখের মণিটি অত্যন্ত যত্নে নিজের হাত মোবারকে নিলেন এবং পরম মমতায় সেটি আবার সাহাবির চোখের কোটরের ভেতরে যথাস্থানে বসিয়ে দিলেন।
এরপর নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেনার পবিত্র মুখের থুথু মোবারক বা লালা মোবারক সেই চোখের ওপর লাগিয়ে দিলেন।
এক সেকেন্ডে ফিরে এলো দৃষ্টিশক্তি!
সাথে সাথে ঘটে গেল অলৌকিক মোজেজা! নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাত মোবারকের স্পর্শে হযরত কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর চোখের দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি ফিরে পেলেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে চোখটি তীরের আঘাতে অন্ধ হয়ে বাইরে ঝুলে ছিল, সেটি তাঁর অন্য সুস্থ চোখটির চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর, উজ্জ্বল এবং তীব্র দৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে উঠল। পরবর্তী জীবনে তিনি যখন বৃদ্ধ হয়েছিলেন, তখনও তাঁর সেই অলৌকিক চোখটি ছিল একদম যুবকদের মতো তরতাজা।
শেষ কথা
নূর নবীজির মুজিযা- হযরত কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর জীবনের এই অবিশ্বাস্য ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন সৃষ্টি জগতের জন্য পরম রহমত এবং অলৌকিকতার ভাণ্ডার। এই মোজেজা কিয়ামত পর্যন্ত আসা প্রতিটি মুসলমানের ঈমানকে তাজা রাখার জন্য একটি বড় দলিল। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সহীহ ঈমান নসিব করুন। আমীন।










